হিসাব
ভাউচার লেখার নিয়ম: সমিতির প্রতিটি টাকার পেছনে একটি কাগজ
রসিদ, পেমেন্ট, কন্ট্রা আর জার্নাল ভাউচার কখন কোনটা লিখবেন, কী কী ঘর পূরণ করবেন আর কোন ভুলে অডিটে আটকে যান—সহজ ভাষায় ধাপে ধাপে।
১১ অক্টোবর ২০২৬ ৬ মিনিটে পড়ুন
· সোসাইটি কিপার টিম
বছর শেষে অডিটর যখন জানতে চান "এই ৳১২,০০০ কিসের খরচ, কে অনুমোদন করেছেন?", তখন অনেক কোষাধ্যক্ষ পুরনো খাতা আর মোবাইলের মেসেজ ঘাঁটতে থাকেন। সমস্যাটা হিসাবের নয়, কাগজের—লেনদেনের দিনই একটি ঠিকঠাক ভাউচার লেখা হয়নি। এই লেখায় আমরা সমিতির জন্য ভাউচার লেখার নিয়ম সহজভাবে সাজিয়েছি, যাতে প্রতিটি টাকার পেছনে একটি পরিষ্কার প্রমাণ থাকে।
ভাউচার আসলে কী, আর কেন দরকার
ভাউচার (voucher) হলো একটি লেনদেনের লিখিত প্রমাণ ও নির্দেশ—কত টাকা, কোন খাত থেকে কোন খাতে, কেন, আর কে অনুমোদন করলেন। খাতায় (ledger) যে এন্ট্রি ওঠে, তার উৎস হওয়া উচিত একটি ভাউচার। ভাউচার না থাকলে এন্ট্রিটা শুধু একটি সংখ্যা, যার পেছনে কোনো ব্যাখ্যা নেই।
সমিতির টাকা সদস্যদের টাকা। তাই "কোষাধ্যক্ষ জানেন" যথেষ্ট নয়—পরের কমিটি, অডিটর বা সাধারণ সভায় যে কেউ প্রশ্ন করলে কাগজ দেখিয়ে উত্তর দিতে পারাটাই স্বচ্ছতা।
চার ধরনের ভাউচার: কখন কোনটা
সমিতির প্রায় সব লেনদেন এই চার ধরনের মধ্যে পড়ে:
| ভাউচার | কখন লিখবেন | উদাহরণ |
|---|---|---|
| রসিদ ভাউচার (Receipt) | টাকা সমিতিতে ঢুকলে | ফ্ল্যাট মালিকের মাসিক সার্ভিস চার্জ জমা |
| পেমেন্ট ভাউচার (Payment) | টাকা সমিতি থেকে বের হলে | নিরাপত্তাকর্মীর বেতন, বিদ্যুৎ বিল |
| কন্ট্রা ভাউচার (Contra) | নিজের নগদ আর ব্যাংকের মধ্যে টাকা সরালে | নগদ ৳৫০,০০০ ব্যাংকে জমা |
| জার্নাল ভাউচার (Journal) | নগদ-ব্যাংক ছাড়া সমন্বয় | ভুল খাত সংশোধন, বকেয়া মওকুফ, অবচয় |
সবচেয়ে বেশি গোলমাল হয় কন্ট্রা নিয়ে। নগদ টাকা ব্যাংকে জমা দেওয়া আয়ও নয়, খরচও নয়—শুধু এক পকেট থেকে আরেক পকেটে যাওয়া। একে রসিদ বা পেমেন্ট হিসেবে লিখলে আয়-ব্যয় দুটোই ফুলে যায়।
ভাউচার লেখার নিয়ম: যে ঘরগুলো কখনো ফাঁকা রাখবেন না
একটি ভালো ভাউচারে অন্তত এই তথ্যগুলো থাকা দরকার:
- ভাউচার নম্বর — ধারাবাহিক, কোনো নম্বর বাদ না দিয়ে। ধরন অনুযায়ী আলাদা সিরিজ রাখলে খোঁজা সহজ (যেমন রসিদ আর পেমেন্টের আলাদা ক্রম)।
- তারিখ — লেনদেনের আসল তারিখ, লেখার তারিখ নয়।
- ডেবিট ও ক্রেডিট খাত — কোন হিসাবে টাকা গেল, কোন হিসাব থেকে এল। যেমন "নিরাপত্তা বেতন" ডেবিট, "নগদ" ক্রেডিট।
- টাকার অঙ্ক — অঙ্কে ও কথায় দুটোই, যাতে পরে কেউ সংখ্যা বদলাতে না পারে।
- বিবরণ (narration) — এক লাইনে পরিষ্কার কারণ। "বেতন" নয়, লিখুন "সেপ্টেম্বর মাসের ২ জন নিরাপত্তাকর্মীর বেতন"।
- সংযুক্ত প্রমাণ — বিল, ক্যাশ মেমো, ব্যাংক স্লিপ বা বিকাশ/নগদের ট্রানজ্যাকশন আইডি।
- প্রস্তুতকারী ও অনুমোদনকারীর নাম-স্বাক্ষর — যিনি লিখলেন আর যিনি অনুমোদন দিলেন, দুজন আলাদা মানুষ হলে ভালো।
টিপ: বিবরণ এমনভাবে লিখুন যেন তিন বছর পর নতুন কোষাধ্যক্ষ পড়েও বুঝতে পারেন। "বিবিধ" শব্দটি যত কম ব্যবহার করবেন, অডিট তত সহজ হবে।
একটি উদাহরণ ধরে দেখা যাক
ধরুন ১২০ ফ্ল্যাটের একটি অ্যাপার্টমেন্ট সমিতি লিফট মেরামতের জন্য একটি প্রতিষ্ঠানকে ৳৮,৫০০ ব্যাংক চেকে পরিশোধ করল। পেমেন্ট ভাউচারে লেখা হবে:
- ডেবিট: লিফট রক্ষণাবেক্ষণ — ৳৮,৫০০
- ক্রেডিট: ব্যাংক হিসাব — ৳৮,৫০০
- বিবরণ: "৩ নম্বর লিফটের দরজার মোটর মেরামত, বিল নং সংযুক্ত, চেকে পরিশোধ"
- সংযুক্তি: সরবরাহকারীর বিল, চেকের কপি বা ব্যাংক স্টেটমেন্টের লাইন
যদি একই কাজের বিল আগে পাওয়া যায় আর টাকা পরে দেওয়া হয়, তাহলে আগে সরবরাহকারীর বিল (দেনা হিসেবে) তুলে রাখা আর পরে পেমেন্ট দিয়ে সেই দেনা মেটানো আরও পরিষ্কার পদ্ধতি।
সাধারণ ভুল যেগুলো অডিটে ধরা পড়ে
- একাধিক খরচ এক ভাউচারে — চা-নাশতা, বাল্ব আর রিকশা ভাড়া এক লাইনে "অফিস খরচ" লিখলে খাতওয়ারি হিসাব নষ্ট হয়।
- ভাউচার পরে লেখা — মাস শেষে স্মৃতি থেকে লিখলে অঙ্ক আর তারিখ দুটোই ভুল হওয়ার ঝুঁকি।
- কাটাকাটি ও ঘষামাজা — ভুল হলে নতুন সংশোধনী (জার্নাল) ভাউচার দিন, পুরনোটায় ঘষবেন না।
- নিজে লিখে নিজে অনুমোদন — এক ব্যক্তির হাতে পুরো প্রক্রিয়া থাকলে ভুল বা অনিয়ম ধরা কঠিন।
- নম্বর বাদ পড়া — বাতিল ভাউচারও ফেলবেন না; "বাতিল" লিখে রেখে দিন, যাতে ক্রম ভাঙা না দেখায়।
ভাউচার সংরক্ষণ: ফাইল সাজানোর সহজ উপায়
কাগজের ভাউচার মাসভিত্তিক ফাইলে, নম্বর অনুযায়ী সাজিয়ে রাখুন। প্রতিটি ফাইলের ওপর মাস আর ভাউচার নম্বরের সীমা লিখে দিন। কতদিন রাখতে হবে, তা আপনার সমিতির গঠনতন্ত্র বা নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের নিয়মে দেখে নিন; প্রয়োজনে একজন হিসাববিদের পরামর্শ নিন।
বিল বা স্লিপের ছবি মোবাইলে তুলে মাসওয়ারি ফোল্ডারে রাখলে কাগজ হারালেও প্রমাণ থাকে।
আপনার সংগঠন যদি সঞ্চয়-ঋণভিত্তিক সমবায় হয়, তাহলে সমিতি কিপার দেখে নিন — সদস্য, সঞ্চয়, লোন ও কিস্তির পুরো হিসাব এক জায়গায়। আর অল্প সদস্যের সমিতির জন্য আছে ছোট সমিতির হিসাব রাখার অ্যাপ — সমিতি কিপার লাইট।
সোসাইটি কিপারে ভাউচার কীভাবে কাজ করে
সোসাইটি কিপারে রসিদ, পেমেন্ট, সরবরাহকারীর বিল, জার্নাল ও কন্ট্রা—সব ধরনের ভাউচার আলাদা করে লেখা যায়, আর মেকার-চেকার পদ্ধতিতে একজন লেখেন, আরেকজন অনুমোদন দেন। অনুমোদিত ভাউচার থেকেই লেজার, ক্যাশ ও ব্যাংক বই, রেওয়ামিল আর আয়-ব্যয় হিসাব নিজে থেকে তৈরি হয়। সদস্যের চাঁদা জমা নিলে নম্বরযুক্ত রসিদ ও এসএমএস চলে যায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে। নিজের সমিতির হিসাবে কেমন দেখায় দেখতে ফ্রি ডেমো নিয়ে দেখুন।
#ভাউচার #কোষাধ্যক্ষ #হিসাব রক্ষণ #অডিট